আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি - নব্য জায়ানোবাদী
- একদিকে গাজার জন্য দু্ঃখবোধ অন্যদিকে আর্জেন্টিনাকে সাপোর্ট এ হলো পৃথিবীর সবথেকে বড় মুনাফিকী-
আমাদের দেশে ফুটবল প্রেমীদের বড় একটি অংশ আর্জেন্টিনার ফ্যান,বিশ্বকাপ এলে পাড়ায় পাড়ায় জায়গা-জমি বিক্রি করে মাইলের পর মাইল বড় বড় পতাকা টানানো হয়, কে কার থেকে বড় পতাকা বানানাইতে পারে এই নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে ।
প্রিয় দলের জয়ে আকাশে আতশবাজি ওড়ে, আর হারে একে অপরের সাথে মারামারি করতেও আমাদের বাঁধে না,কোন ক্লাবে কখন খেলা, মেসির পায়ে আজ কী জাদু দেখা গেল এসব আপডেটে আমরা সবসময় বুঁদ হয়ে থাকি , এই অন্ধত্বের মাঝে যখন কেউ ধর্মীয় বাণী শুনায় তখন আমরা চেইতা যাই
“আরে ভাই, সব জায়গায় কেন ধর্মকে টানেন? খেলা তো নিছক বিনোদন! এখানেও পলিটিক্স আর ধর্ম না আনলে হয় না? আপনাদের জন্যই দিদনিন ইসলামফোবিয়া বাড়ছে পাশ্চাত্য গবেষকরা ঠিকই বলে কিছু খারেজি ফতুয়াবাজদের ইসলাম কঠোর করার কারণে আজকে খোদ মুসলিমরাও ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ।
তাছাড়া অমুক বড় ভাই তো ফেসবুকে পোস্ট করে বলেছেই ,খেলা স্রেফ এনজয়মেন্ট, এটাকে ওভাবে নেওয়ার কিছু নেই। সে কি আপনাদের চেয়ে কম বোঝে?”
না ভাই, সে-ও কম বোঝে না, আমরাও বেশি বুঝি না। তাই এই লেখায় কোনো ধর্মীয় আলাপ হবে না আজ এখানে শুধু কয়েকটা তথ্য পেশ করা হবে এরপর বিবেক কী রায় দেয়, তা সম্পূর্ণ আপনার ওপর।
যে আর্জেন্টিনার জন্য আমাদের বুকভরা ভালোবাসা, যাদের বিজয়ে চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ে
অথচ ওরাই নিরিহ মাজলুম বাচ্চাদের অশ্রুর কারণ, ছোট্ট বাচ্চাদের কলি থেকে ফোটার আগেই বোমার আঘাতে ঝড়ে পড়ার কারণ, আপনি যে দেশটিকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে রাখছেন, সেই দেশটিই বিশ্বমঞ্চে খুনি জায়নবাদীদের সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে ।
নিচে তার কয়েকটি তথ্য দেওয়া হলো এরপর বিবেচনা আপনার উপর ।
১)
আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই (Javier Milei) কট্টর ইজ্রাইলপন্হী,
সে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ইহুদি প্রতিষ্ঠান ইয়েশিভা ইউনিভার্সিটিতে (Yeshiva University) বক্তব্য দেওয়ার সময় বুক ফুলিয়ে বলেন—"I am proud to be the most Zionist president in the world" (আমি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট হতে পেরে গর্বিত)।
সেইসাথে সে নিজেকে এবং আর্জেন্টিনাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান করিয়ে, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে বলেন “আমরাই জিতব"
২) ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাভিয়ের মিলেই ইসরায়েল সফরে যান,সেখানে গিয়ে তিনি ক্রাইং ওয়ালে (Western Wall) কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং
ঘোষণা দেন যে, আর্জেন্টিনার سفارتখানা বা দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে সরাসরি জেরুজালেমে নেওয়া হবে,আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি মূলত ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি অবৈধ দখলদারিত্ব এবং জেরুজালেমের ওপর তাদের একক আধিপত্যকে সরাসরি আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
৩)
যখনই জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার জন্য কিংবা গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে সাধারণ মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো প্রস্তাব এনেছে, আর্জেন্টিনা প্রতিবার তার বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে বিশ্বের ১৪৩টি দেশ যখন ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দিয়ে মানবতার জয়গান গেয়েছে, তখন আর্জেন্টিনা আমেরিকার সাথে সুর মিলিয়ে ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ এবং ২০২৬ সাল জুড়েও আর্জেন্টিনার সরকার প্রতিটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসরায়েলকে তাদের অন্যতম প্রধান মিত্র হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এই সমর্থন জারি রেখেছে।
৪) Argentina gov এর অফিসিয়াল নথি অনুযায়ী ১২ জুলাই ২০২৪ - আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলেই একটি বিশেষ সরকারি ডিক্রি জারি করেন যির মাধ্যমে তিনি হামাসকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি "আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন" হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন এবং আর্জেন্টিনার মাটিতে তাদের সমস্ত সম্ভাব্য আর্থিক সম্পদ ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন ।
৫) ব্রিকস (BRICS) জোটে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি নতুন করে মিশর, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মুসলিম দেশগুলো যোগ দিয়েছিল,এই জোটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক রাজনীতিতে আমেরিকার একক আধিপত্য কমানো এবং ফিলিস্তিন সংকটে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া। আর্জেন্টিনা এই জোটের সদস্য হওয়ার কথা থাকলেও মিলেই বলেন—"আমরা কোনো কমিউনিস্ট বা মুসলিম ব্লকের সাথে যাব না, আমাদের একমাত্র বন্ধু আমেরিকা আর ইসরায়েল।" ইসলাম বিদ্বেষী ও ইজ্রাইল প্রিতির জন্য আর্জেন্টিনার এই জোট থেকে সরে আসেন ।
এই তথ্যগুলো মাথায় রেখে একটা সহজ পয়েন্ট ভাবুন তো পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্র কখনো কী একা গণহত্যা চালাতে পারে ? না সম্ভব না । আন্তর্জাতিক সমাজে তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য, তাদের অপরাধকে জাস্টিফাই করার জন্য কিছু অদৃশ্য সহযোগি দরকার হয় গাজায় ইসরাইলি এই গনহত্যার সেই অদৃশ্য সহযোগিদের অন্যতম হলো আর্জেন্টিনা ।
তাদের এই অদৃশ্য সহযোগিতায় নির্মম বলি হচ্ছে গাজার নিষ্পাপ শিশুরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, চলমান এই সুপরিকল্পিত গণহত্যায় এ পর্যন্ত ১৫,০০০-এরও বেশি নিষ্পাপ শিশু প্রাণ হারিয়েছে কিন্তু আমরা জানি বাস্তব সংখ্যা এর চেয়েও শতগুণ বেশি ।
গাজার মাটি আজ শিশুদের রক্তে ভেজা,সেখানে কোনো শিশুর হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন, কোনো নিষ্পাপ প্রাণ স্তূপীকৃত কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে পচে যাচ্ছে, আর কেউ হয়তো হাসপাতালের করিডোরে নিজের জন্মদাতার লাশ ধরে বুকফাটা আর্তনাদ করছে।
যে বয়সে ওদের হাতে রঙিন বই-খাতা থাকার কথা ছিল, সেই বয়সে ওদের শরীর সাদা কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে মাটির নিচে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন সেখানে গড়ে প্রায় ১০০ জন শিশু মারা যাচ্ছে বা চিরতরে পঙ্গু হচ্ছে ,এটা কোনো যুদ্ধ নয়, এটা একটা আস্ত প্রজন্মকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলার নোংরা উৎসব আর এই উৎসবের পেছনে পরোক্ষভাবে অবদান রাখছেন আপনি, আমি, আমরা।
আমরা যখন এই কসাইদের রাষ্ট্রকে ভালোবেসে লাখ টাকা খরচ করি, মাইলের পর মাইল নীল-সাদা পতাকা টানাই, তখন বিশ্বমঞ্চে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্ত হয়। আমরা যখন তাদের এই নোংরা নীতি জানার পরও অন্ধ উল্লাসে মেতে থাকি, তখন আমরাও কি পরোক্ষভাবে একজন অপ্রকাশ্য খুনির ভূমিকায় অবতীর্ণ হই না? আপনার বিবেকবোধ কি বলে ?
মানলাম ফুটবলকে ভালোবাসা অপরাধ নয়, বিনোদন নেওয়াও অন্যায় নয় কিন্তু বিনোদনের চশমাটা যখন আমাদের এতটাই অন্ধ করে দেয় যে, আমরা মজলুমের রক্ত আর জালেমের উল্লাসের পার্থক্য ভুলে যাই তখন আমাদের মানবিক বোধটা ঠিক কোথায় দাঁড়ায় ?
হুজুররা আসলেই বাড়াবাড়ি করে তাই না? এইজন্য ধর্মকে সাইডে রাখলাম একজন মানুষ হিসেবে কারো দ্বারা আর্জেন্টিনাকে সাপোর্ট করা সম্ভব ?
এই অদৃশ্য সহযোগিদের সাপোর্ট করতে তাদের হাত শক্ত করতে মানুষ হিসেবে আপনার বিবেক বাঁধে না?
নাকি মানুষত্য ধ্বসে পড়েছে ।
• পরের বার যখন নীল-সাদা জার্সি পরিধান করা বা আর্জেন্টিনার পতাকা আকাশে ওড়ানোর পূর্বে একবার বুকে হাত দিয়ে ভাববেন—এই পতাকার পেছনের রাষ্ট্রপ্রধানটি কিন্তু গাজার শিশুদের অদৃশ্য হত্যাকারী ।ফুটবলের ওই চামড়ার বলটার চেয়ে গাজার একটা নিষ্পাপ শিশুর জীবনের মূল্য কিন্তু অনেক বেশি ভাই । আপনার উল্লাস যেন কোনো মায়ের বুকফাটা কান্নার ওপর উপহাস না হয়ে দাঁড়ায়।
আব্দুর রহিম আম্মার
৭৮৯২