DGFI ও DB এর আন্ডারগ্রাউন্ড এজেন্ট - আর এস ফাহিম, তৌহিদ আফ্রিদি, রুবাইয়্যাত ফাতেমা তনী
আফ্রিদী, ফাহিম ও তনী: অন্তরালের কিছু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
আফ্রিদী, ফাহিম ও এজেন্ট তনীর ব্যাপারে এই তথ্যগুলো আরও আগেই বলা উচিত ছিল। তবে গতকাল ফাহিম দেশে ফেরার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সেই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ও ঘটনাগুলোর একটি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
আর এস ফাহিম, তৌহিদ আফ্রিদী ও রুবাইয়াত তনী প্রকাশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিত্তিক ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে পরিচিত হলেও অভিযোগ রয়েছে যে, তারা গোপনে রাজনৈতিক আন্ডারকভার নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করতেন। তাদের সঙ্গে ডিবি হারুন ও র্যাব ১১ এর গোপন যোগাযোগ ছিল বলেও দাবি করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এই যোগাযোগ ছিল কেবল সামাজিক বা আনুষ্ঠানিক নয়; বরং আরও গভীর ও সংবেদনশীল কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
১. অপহরণ ও নির্যাতনকেন্দ্রের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে যে, আফ্রিদী ও ফাহিমের নেতৃত্বে একটি সংগঠিত গ্রুপ অপহরণ ও নির্যাতনের কাজে জড়িত ছিল। ডিবির কাছে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত কিছু ব্যক্তিকে তুলে এনে নির্যাতন করা হতো বলে দাবি করা হয়। কথিত আছে, এই নির্যাতনকেন্দ্রটি ছিল ডিবি কর্মকর্তার নিয়মিত অফিস ব্যবহারের স্থানটির আন্ডারগ্রাউন্ড অংশে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তি বা ইনফ্লুয়েন্সারকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি আটক করতে পারত না বা প্রকাশ্যে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল না, তাদের ক্ষেত্রে এই গ্রুপটি চাপ সৃষ্টি, হুমকি বা নির্যাতনের মাধ্যমে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করত। এছাড়া দাবি করা হয় যে, আওয়ামী লীগের থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন’ (CRI) এবং ‘ক্যাম্পেইন অ্যাডভোকেসি প্রোগ্রাম’ (CAP) এর নীতিগত পরিকল্পনার আওতায় ইনফ্লুয়েন্সারদের সম্পৃক্ত করে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
২. জুলাই অভ্যুত্থান ও বর্তমান রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রলীগ ও যৌথবাহিনীর অভিযানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় ফাহিমের সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ মোহাম্মদপুরের কাউন্সিলর রাজিবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও সহিংস ঘটনায় যুক্ত ছিলেন।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে যে, বর্তমান বিএনপি ঘনিষ্ঠ প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের নির্বাচনী প্রচারণার জনসংযোগ কার্যক্রমও ফাহিমের টিম পরিচালনা করেছিল। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ফাহিম দেশে ফেরার পর তার এক সহযোগীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে দাবি করা হয় যে, তার মামা মিজানুর রহমান কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং স্থানীয়ভাবে ব্যবসায়ী ও সাবেক নির্বাচনী প্রার্থী। পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয় যে, তার ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও রয়েছেন। পোস্টটির ভাষ্য ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
জুলাইয়ের সহিংসতার ঘটনায় ফাহিমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয় এবং তা এখনো বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও তাকে গ্রেফতার না করে বিমানবন্দরে সংবর্ধনার মাধ্যমে দেশে ফেরানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক্ষেত্রে কার তত্ত্বাবধান বা প্রভাব কাজ করেছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
৩. রুবাইয়াত তনী ও অর্থ পাচারের অভিযোগ
রুবাইয়্যাত ফাতেমা তনীর বিরুদ্ধেও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রকাশ্যে তিনি পোশাক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও অভিযোগ অনুযায়ী, এর আড়ালে দেশ থেকে অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিশেষ করে দুবাইয়ে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একাধিক আলোচিত বিয়ের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসেন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অর্থ জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত মো. সিদ্দিককে বিয়ে করেন বলে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে যে, সিদ্দিক ও তার সহযোগীরা একটি আন্তর্জাতিক সাইবার জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিদেশি নাগরিকের ই-মেইল হ্যাক করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার করেন। সমালোচকদের মতে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির এই সম্পর্ক আর্থিক লেনদেন ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত সন্দেহকে আরও জোরদার করেছে।
৪. বিচারহীনতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
গুরুতর সব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখনো প্রকাশ্যে সক্রিয় রয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই ফাহিমের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং প্রকাশ্য উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে রুবাইয়্যাত তনী সাম্প্রতিক সময়ে নারীবাদী কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন এবং জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না।
জুলাইয়ের সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনার পরও অভিযুক্তদের প্রকাশ্য কার্যক্রম এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিচারপ্রত্যাশার মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন, আর আহতদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।